বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো নয় মাস ধরে যে বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছিল, ধারণা করা হয় তার মূল পরিকল্পনা করেছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা রাও ফরমান আলী।
যদিও পরবর্তীতে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হবার পর রাও ফরমান আলীর একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম ছিল।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত একজন ইতিহাসবিদের বক্তব্য, বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে হত্যা করার জন্য রীতিমত নির্দেশনা দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমাণ্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি।
অবশ্য ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এও বলছেন যে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে তেমন কোন গবেষণা হয়নি, ফলে এসব তথ্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না।
যুদ্ধের পুরো নয় মাস ধরে বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে হত্যা করা হলেও ষোলই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিজয় দিবসের দিনকয়েক আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ও তার সহযোগীদের শেষ আঘাতটি ছিল বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের তালিকা ধরে ধরে হত্যাকাণ্ড।
যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন তাদের তালিকায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা। হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল আলবদর বাহিনী।
১৪ই ডিসেম্বর রাতে একযোগে বহু বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়।
বাংলাপিডিয়ার হিসাব বলছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ হাজার ১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ঢাকায়। ১৪৯ জন।
রাও ফরমানের ডায়েরি
বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, আল-বদর বাহিনী জড়িত থাকলেও পরিকল্পনাটি কে, কখন কীভাবে করেছে, সেটা এখনো গবেষকদের কাছে পরিষ্কার নয়।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”পরিকল্পনা ঠিক কী করে করেছে, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ২৫শে মার্চ রাত থেকে ১৪ই ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী- সারা দেশের শহরে এবং গ্রামে তাদের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।”
ঢাকার পতনের পর গভর্ণর হাউজ, যেটি এখন বঙ্গভবন নামে পরিচিত, সেখান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা রাও ফরমান আলীর একটি ডায়রি পাওয়া যায়। সেখানে অনেক নিহত ও নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীর নাম লেখা।

১৯৭১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার বুদ্ধিজীবী
নিয়াজির ‘নীলনকশা’
মুনতাসির মামুন বলছেন, পাকিস্তানি ব্যবসায়ী আবদুল লতিফ বাওয়ানির বাসা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পর কিছু নথি পাওয়া যায়, যাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর নির্দেশনা পাওয়া যায়।
এটাকে ‘নিয়াজির নীলনকশা’ বলে বর্ণনা করছেন মি. মামুন।
ওই নির্দেশনার মধ্যে বাঙ্গালি কোন কর্মকর্তাকে কোন পদে না রাখার পরিকল্পনা ছিল। এই পরিকল্পনার সঙ্গে তখনকার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সবাই জড়িত ছিলেন, বিবিসিকে বলেন মি. মামুন।
২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক এবং ডাক্তারদের হত্যাকাণ্ডের জন্য চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
সেই সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সমন্বয়ক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম. কে রহমান আদালতকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খানের নির্দেশনায় এবং সম্পৃক্ততায় ১৯৭১ সালে যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরে বাংলাদেশের যুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী সংগঠন আল বদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। মি. মুঈনুদ্দীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অপারেশন ইন-চার্জ এবং মি. আশরাফ ছিলেন চিফ এক্সিকিউটর।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, “ঢাকায় বা বড় কয়েকটি শহরগুলোয় অবাঙ্গালীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসাবে এই ধরনের কাজ করেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বাঙ্গালি রাজাকার, মুসলিম লীগাররা সেনাবাহিনী নিয়ে এসে লোকজনকে চিনিয়ে দিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পরামর্শ দিয়েছে”।
কেন এই হত্যাকাণ্ড?
একাত্তরের ২৫শে নভেম্বর রাজশাহী শহরের বাসা থেকে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর আব্দুল কাইয়ুমকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শিক্ষক মি. কাইয়ুমকে যখন তুলে নেয়া হয় তখন রাত আনুমানিক নয়টা।
রাত নয়টার দিকে এক ব্যক্তি মি. কাইয়ুমের বাসা গিয়ে জানান যে, তাকে বাইরে একজন আর্মি অফিসার ডাকছে।
মি. কাইয়ুম ওই আর্মি অফিসারের সাথে দেখা করার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে আর কখনো ফিরে আসেননি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দুইদিন পরে রাজশাহীর শহরের কাছে পদ্মার চরে একটি গণকবরে শিক্ষক মীর আব্দুল কাইয়ুমের মরদেহ পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা বলছেন, ২৫শে মার্চের পর থেকেই আসলে সারা বাংলাদেশজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার আর হত্যা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নভেম্বর মাস থেকে সেই কর্মকাণ্ড আরও জোরদার করে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিষয়টি ছিল পুরো পরিকল্পিত আর এটা শুরু হয়েছিল সেই ২৫শে মার্চ থেকেই। কারণ আমরা দেখি, প্রথম আক্রমণ কিন্তু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর কারণ ছিল। সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কিন্তু প্রথম দাঁড়িয়েছিল ছাত্র-শিক্ষকরা। সুতরাং সেই আইয়ুব খানের আমল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সামরিক শাসকদের একটা ক্ষোভ ছিল। পরবর্তীতে সেটার আরও বিস্তার হয়েছে।”
”সামরিক জান্তা পরিকল্পনা করেছিল, দেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দিলে বাংলাদেশ যদি কোন দিন স্বাধীন হলেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এই চিন্তা থেকেই তারা বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে শুরু করেছিল,” বলছেন মি. মামুন।
”সেই ৪৭ সাল থেকে রাজনীতিবিদরা মানুষকে একত্রিত করেছেন, কিন্তু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, প্রণোদনা দেয়া- সেটা কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা করেছেন। ছাত্রদের বিবেচনায় নিলে ভাষা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন থেকে সব ক্ষেত্রেই বুদ্ধিজীবীরা বড় একটি ভূমিকা পালন করেছেন,” তিনি বলছেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, তাদের মূল টার্গেট ছিল ছাত্ররা এবং শিক্ষাঙ্গনগুলো।
ইতিহাসবিদরা বলেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের বাংলাদেশী সহযোগীদের মাধ্যমে আল-বদর বাহিনী গঠন করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।
Development by: webnewsdesign.com